মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরানোর দাবিতে এবার সরাসরি বিধানসভায় প্রস্তাব আনছে কেরলের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার। সোমবার, ১২ অক্টোবর কেরল বিধানসভার দ্বিতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনেই এই প্রস্তাব পেশ করার কথা। মুখ্যমন্ত্রী ভি. ডি. সতীশন নিজেই বিধানসভায় প্রস্তাবটি উত্থাপন করবেন।
এই প্রস্তাব পাশ হলে দেশের প্রথম কোনও রাজ্য বিধানসভা হিসেবে কেরলই কোনও কার্যরত মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দাবি জানিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব গ্রহণ করবে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচনী কমিশনারদের নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে যে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে, তার মধ্যেই কেরলের এই পদক্ষেপকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
শুধু জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর দাবি নয়
কেরল সরকারের প্রস্তাবে মোট তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি রাখা হয়েছে।
প্রথম দাবি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে অপসারণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে হবে।
দ্বিতীয় দাবি, Special Intensive Revision বা SIR-এর সময় ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া সমস্ত যোগ্য ভোটারের ভোটাধিকার পুনরায় ফিরিয়ে দিতে হবে। তবে তার আগে SIR প্রক্রিয়ায় যে সমস্ত ত্রুটি বা অনিয়ম হয়েছে, সেগুলি সংশোধনের দাবি জানানো হয়েছে।
তৃতীয় দাবি, নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের জন্য যে কমিটি রয়েছে, তা পুনর্গঠন করতে হবে। প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং ভারতের প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে একটি কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে।
SIR নিয়ে কেন এত আপত্তি?
প্রস্তাবে অভিযোগ করা হয়েছে, SIR-এর নামে বিপুল সংখ্যক যোগ্য নাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু, অভিবাসী শ্রমিক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং তরুণ ভোটারদের ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
কেরল সরকারের বক্তব্য, প্রযুক্তিগত ত্রুটি এবং প্রক্রিয়াগত অনিয়মের কারণে কোনও যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার নষ্ট হওয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিপন্থী। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে বলে প্রস্তাবে দাবি করা হয়েছে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, প্রস্তাবে SIR-এর কারণে কেরলেই নির্দিষ্টভাবে কতজন যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, তার কোনও নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি SIR চলাকালীন কেরলে যোগ্য ভোটার বাদ যাওয়ার অভিযোগ কংগ্রেস বা CPI(M)-এর পক্ষ থেকেও নির্দিষ্টভাবে তোলা হয়নি বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিরোধী LDF-ও পাশে
এই প্রস্তাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক হল, কেরলের প্রধান বিরোধী দল CPI(M)-এর নেতৃত্বাধীন LDF-ও প্রস্তাবটিকে সমর্থন করতে চলেছে। ফলে বিধানসভায় এটি পাশ হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।
১৪০ আসনের কেরল বিধানসভায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন UDF-এর হাতে রয়েছে ১০২টি আসন। LDF-এর রয়েছে ৩৫টি এবং BJP-এর তিনজন বিধায়ক। ফলে সংখ্যার বিচারে সরকারের প্রস্তাব পাশ করানো কঠিন হওয়ার কথা নয়।
আগেও SIR-এর বিরুদ্ধে প্রস্তাব এনেছিল LDF
জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বর্তমান প্রস্তাবটি কেরল বিধানসভায় SIR নিয়ে প্রথম পদক্ষেপ নয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন CPI(M)-নেতৃত্বাধীন LDF সরকারও বিধানসভায় SIR-এর বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব এনেছিল।
সেই প্রস্তাবে দেশজুড়ে SIR চালুর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছিল। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে পাশ হয়েছিল এবং সেই সময় কেরলই প্রথম রাজ্য বিধানসভা হিসেবে SIR-এর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অবস্থান নিয়েছিল।
কংগ্রেসের বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশল?
জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর দাবিতে কংগ্রেস এবং CPI(M)—দুই দলই জাতীয় স্তরে আন্দোলন করছে। সেই আবহে কেরল বিধানসভায় এই প্রস্তাবকে কেন্দ্রের উপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
কংগ্রেসের এই অবস্থান শুধু কেরলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। অন্যান্য বিরোধী বা কংগ্রেসশাসিত রাজ্যেও একই ধরনের প্রস্তাব আনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
তবে জ্ঞানেশ কুমারকে সরানো কি এত সহজ?
এখানেই রয়েছে আইনি জটিলতা। সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে অপসারণের মতো প্রক্রিয়ায় সরানো যায়। অর্থাৎ শুধু কোনও রাজ্য বিধানসভায় প্রস্তাব পাশ হলেই CEC পদ থেকে অপসারিত হবেন না।
তাই কেরল বিধানসভার প্রস্তাব মূলত একটি রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বার্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে কেন্দ্রের কাছে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, ভোটার তালিকার ত্রুটি সংশোধন এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের পদ্ধতি বদলের দাবি আরও জোরালো করা হবে।

