ভোট কারচুপি বা ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি এবং প্রতিবাদ কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা—এই একাধিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে ফের উত্তপ্ত জাতীয় রাজধানী দিল্লি। সোমবার, ১২ অক্টোবর, ‘INDIA’ জোটের একাধিক শরিক দল একসঙ্গে রাস্তায় নামে। কংগ্রেসের পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিএম, সিপিআই, সমাজবাদী পার্টি, আরজেডি-সহ একাধিক বিরোধী দলের নেতারা কর্মসূচিতে অংশ নেন।
বিরোধীদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতেও সরব হয়েছে বিরোধী শিবির। এই দাবিকে সামনে রেখেই দিল্লিতে একের পর এক কর্মসূচি পালন করছে INDIA জোটের দলগুলি।
সুপ্রিম কোর্টের পথে বিরোধীদের মিছিল
সোমবার দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাব এলাকা থেকে বিরোধী নেতারা মিছিল শুরু করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরা। মিছিলে নেতৃত্ব দেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে।
মিছিলে উপস্থিত ছিলেন সিপিএম নেতা এম এ বেবি, সিপিআই নেতা ডি রাজা, আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব, এনসিপি (এসপি)-র সুপ্রিয়া সুলে, শিবসেনা (UBT)-র সঞ্জয় রাউত এবং অন্যান্য বিরোধী নেতারা। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও নেতৃত্ব ও কর্মীরা কর্মসূচিতে অংশ নেন।
কিন্তু মিছিল এগিয়ে যাওয়ার সময় দিল্লি পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে পথ আটকে দেয়। Bhagwan Dass Road এলাকায় আটকে দেওয়া হয় বিরোধীদের মিছিল। এরপর রাস্তাতেই স্লোগান ও প্রতিবাদ শুরু করেন নেতাকর্মীরা।
কংগ্রেস-তৃণমূল-সিপিএম কি ফের এক মঞ্চে?
দিল্লির এই কর্মসূচিতে কংগ্রেসের পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেস এবং বাম দলগুলির উপস্থিতি রাজনৈতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ রাজ্যভিত্তিক রাজনীতিতে এই দলগুলির মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল ও বাম-কংগ্রেসের সম্পর্ক বরাবরই জটিল।
তবে জাতীয় স্তরে BJP-র বিরুদ্ধে একাধিক ইস্যুতে বিরোধী দলগুলিকে এক মঞ্চে দেখা যাচ্ছে। এর আগে সেপ্টেম্বরের শেষেও INDIA জোটের বৈঠকে SIR এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে যৌথ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সেই বৈঠকে কংগ্রেস, তৃণমূল, সিপিএম, সিপিআই, NCP(SP), শিবসেনা (UBT)-সহ একাধিক দল অংশ নিয়েছিল।
অর্থাৎ, রাজ্য রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্তরে BJP এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কিছু ইস্যুতে বিরোধী দলগুলির মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা যে চলছে, দিল্লির সাম্প্রতিক কর্মসূচি তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
‘ভোট চুরি’র অভিযোগে সরব রাহুল
মিছিলের আগে কংগ্রেসের সাংবাদিক বৈঠকে রাহুল গান্ধী নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান। তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করা হচ্ছে।
রাহুলের বক্তব্য, এই লড়াই শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের নয়—গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার লড়াই। তিনি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিও পুনরায় তোলেন।
এর আগে ৭ অক্টোবরও INDIA জোটের নেতারা দিল্লিতে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছিলেন। সেই কর্মসূচিতে রাহুল গান্ধীকে আটক করা হয় এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধী-সহ একাধিক বিরোধী নেতার সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তির অভিযোগ ওঠে। তৃণমূল, সিপিএম, সিপিআই, RJD-সহ একাধিক দলের সাংসদও সেই প্রতিবাদে ছিলেন।
পুলিশের দাবি, অনুমতি ছাড়াই মিছিল?
অন্যদিকে দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে বিরোধীদের কর্মসূচি নিয়ে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সোমবারের INDIA জোটের মিছিলকে কেন্দ্র করে দিল্লি পুলিশ দুটি FIR দায়ের করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। পুলিশের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে অনুমতি ছাড়া মিছিল এবং ব্যারিকেড ক্ষতিগ্রস্ত করার বিষয়।
এর আগে রাজধানীতে একাধিক প্রতিবাদ কর্মসূচিকে ঘিরে ব্যাপক পুলিশি মোতায়েন এবং ধরপাকড়ের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে দিল্লির রাজপথে বিরোধী বনাম প্রশাসনের সংঘাত ক্রমশ আরও তীব্র রাজনৈতিক রূপ নিচ্ছে।
BJP-র পাল্টা আক্রমণ
বিরোধীদের অভিযোগ অবশ্য সরাসরি খারিজ করেছে BJP। গেরুয়া শিবিরের বক্তব্য, নির্বাচনে রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হওয়ার পর কংগ্রেস এবং INDIA জোটের শরিকরা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিশানা করছে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান কংগ্রেসকে ‘দিশাহীন’ বলে আক্রমণ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, নিজেদের নির্বাচনী ব্যর্থতা আড়াল করতেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে রাস্তায় অশান্তি তৈরি করার চেষ্টা করছে বিরোধীরা।
BJP সভাপতি নীতিন নবীনও বিরোধীদের সাম্প্রতিক আন্দোলনকে তীব্র আক্রমণ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিরোধীরা নির্বাচনী পরাজয় থেকে শিক্ষা না নিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
আগামী দিনে কী হবে?
দিল্লির সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে একটি বিষয় স্পষ্ট—জাতীয় স্তরে BJP-র বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলির যৌথ আন্দোলন ফের গতি পাচ্ছে। কংগ্রেস, তৃণমূল, বাম, সমাজবাদী পার্টি এবং অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলি নিজেদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য সরিয়ে নির্দিষ্ট ইস্যুতে একসঙ্গে আন্দোলনের রাস্তা নিচ্ছে।
তবে এই ঐক্য কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন থাকছেই। কারণ রাজ্যভিত্তিক রাজনীতিতে দলগুলির মধ্যে পারস্পরিক সংঘাত রয়েছে। তবুও নির্বাচন কমিশন, ভোটার তালিকা এবং ‘ভোট চুরি’র অভিযোগের মতো জাতীয় ইস্যু আপাতত বিরোধী দলগুলিকে একই মঞ্চে আনছে।
অন্যদিকে BJP-ও পাল্টা রাজনৈতিক আক্রমণ আরও জোরদার করছে। ফলে দিল্লির রাজপথে INDIA জোট বনাম BJP-র এই সংঘাত আগামী দিনেও আরও উত্তপ্ত হতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

